Home / আত্ম উন্নয়ন / উপস্থাপনা / স্পীকার / কথা বলার টেকনিক। ৮ “C”

কথা বলার টেকনিক। ৮ “C”

মিশুকে ব্যক্তি হচ্ছে সে, যে আপনার সাথে অন্য ব্যক্তিদের ব্যাপারে কথা বলে। বোরিং ব্যক্তি হচ্ছে সে, যে আপনার সাথে নিজের ব্যাপারে কথা বলে, এবং একজন বুদ্ধিমান ব্যক্তি বাকপটু ব্যক্তি হচ্ছে সে, যে আপনার সঙ্গে আপনার ব্যাপারে কথা বলে।

সব জায়গাতে এটি অত্যন্ত জরুরী যে, শব্দের  বিস্তৃত জ্ঞান আর সেগুলো ব্যবহার করার কৌশল আপনার জানা থাকবে।

এই সব সিদ্ধান্ত কথা বলার আর্টের প্রতিটা ক্ষেত্রের জন্য সব থেকে উপযোগী।

পোস্টের বিষয় সূচীঃ

ʘ কথা বলার ৮ টি পদ্ধতি বা ৮ “C”

  1. CLARITY – স্পষ্টতা
  2. CONCRETENESS – নিরেট / মূর্ত্য
  3. CORRECTNESS – সঠিক
  4. CONCISENESS – সংক্ষিপ্ত
  5. COLORFUL – চিত্রিত / রঙিন
  6. COMMONSENSE – সাধারণ জ্ঞান
  7. CREATIVITY – রচনাত্নক
  8. COURTESY – বিনম্রতা, শিষ্টাচার

 

স্পষ্ট কথাঃ

কথোপকথনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে এই পয়েন্টটা। প্রায়ই লোকের মুখে শোনা যায় আমি আসলে এটা বোঝাতে চাই নি।

আপনার কথা গুলো যদি স্পষ্ট না হয় তবে আপনার শ্রোতা কিছুই বুঝতে পারবে না। স্পষ্ট করে কথা বলার প্রয়োজন হচ্ছেঃ

  • আপনার এটা জানা থাকবে যে আপনি ঠিক কি বলতে চান।
  • আপনার কাছে সেই শব্দগুলো থাকবে যেগুলো আপনি সফলতার সঙ্গে অন্যদের বোঝাতে পারবেন।
  • আপনি যা বলতে চাইছেন আপনার বডি ল্যাঙ্গুয়েজও যেন তাই প্রকাশ করে।

 

আমরা সবাই মনে করি যে আমাদের কথা গুলো স্পষ্ট। এটা ঠিক কি’না সেটা আমাদের দৈনন্দিন জীবনের ঘটে চলা বিভিন্ন ঘটনার দিকে দৃষ্টিপাত করলেই বোঝা যাবে।

  • লোকেরা কি প্রায়ই আপনার কথায় ভুল বোঝে?
  • অন্যদের কি আপনার কথা বোঝার জন্য অতিরিক্ত মনোযোগ দিতে হয়?
  • আপনাকে কি প্রায়ই “
    • আরেকবার বলুন,
    • ক্ষমা করবেন, আমি ঠিক শুনতে পাইনি,
    • আপনি কি বানানটা বলবেন,
    • দয়া করে লিখে দিন, ইত্যাদি বাক্যগুলো শুনতে হয়?

যদি এর কোন টার সাথেও আপনার ঘটনা মিলে যায় তবে সময় এসেছে আপনার কথার দিকে আরেকবার হালকা একটু মনোযোগ দেওয়ার।

প্রায় মানুষ কথা বলার সময় সাধারণ কিছু ভুল করে বসেঃ-

তাড়াতাড়ি কথা বলাঃ

একটা মানুষ যখন তাড়াতাড়ি কথা বলা শুরু করে তখন সেখানে ভুল হওয়ার বা স্পষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা কম থাকে। অনেক ক্ষেত্রে সঠিভাবে শব্দ উচ্চারিত হলেও যার সাথে কথা বলা হচ্ছে সে হয়তো দ্রুত বলার কারণে ঠিক বুঝে উঠতে পারে না।

তাই কথা বলার সময় যতটা সম্ভব আস্তে আস্তে কথা বলতে থাকুন।

দেখুন এটা খুব জরুরী একটা বিষয় আপনি যা বলতে চান সেটা সামনের জনকে বুঝতে হবে। তাহলে না হলে সব পন্ডশ্রম হবে।

 

 

কঠিন শব্দের উপযোগঃ

আপনারা জেনে থাকবেন, অনেক শিক্ষকেই ভাল জ্ঞান রাখা সত্বেও কঠিন বা টেকনিক্যাল শব্দ অতিরিক্ত ব্যবহারের কারণে ছাত্র-ছাত্রীদের কাছে জনপ্রিয় হতে পারেন না।

অনেকেই শ্রোতাদের প্রভাবিত করে তোলার জন্য আর নিজের ভাষাজ্ঞান প্রদর্শন করার অন্য কঠিন-কঠিন শব্দের ব্যবহার করেন। যেগুলো সাধারণ শ্রোতাদের বুদ্ধির বাইরে হয়। এইভাবে কঠিন শব্দের ব্যবহার করে আপনি কথা বললে হয়তো কিছু সময়ের জন্য প্রশংসা কুড়াতে পারবেন, কিন্তু সহজ শব্দের প্রয়োগে যে বক্তব্য সেটার প্রভাব শ্রোতাদের নিকট দীর্ঘমেয়াদি হয়।

টেকনিক্যাল শব্দের ব্যবহারঃ

আপনি যার বা যাদের সাথে কথা বলছেন সেই সমস্থ শ্রোতাদের বুদ্ধিবৃত্তির কথা মাথায় রেখে টেকনিক্যাল শব্দের ব্যবহার করতে হবে।

ধীরে কথা বলাঃ

কিছু লোক আছে যারা কথা বলার সময় এত আস্তে কথা বলেন যে, সামনের ব্যক্তি পর্যন্ত তার ঠিকমত শুনতে পান না। ফলে প্রায় ক্ষেত্রেই তার সেই অস্পষ্ট কথার প্রতি তেমন বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হয় না। এই ধরণের ব্যক্তি যদি কোন টিমের সাথে কাজ করে সেই টিমের যোগ্যতার উপরেও প্রশ্নচিহ্ন লাগিয়ে দেওয়া হয়।

তাই যখন কথা বলবেন তখন স্বাভাবিক ভাবে ঠিক মত কথা বলুন যাতে আপনার কথা স্পষ্ট শোনা যায়।

পরিমাপ যোগ্য কথা

যোগাযোগের অন্যতম একটি প্রধান রুপ হচ্ছে নিরেট / মুর্ত্যতা। এটি আপনার কথাপকথনকে পরিমাপ করে। কোন একটি বাক্যকে আরো বেশি নির্দিষ্ট করে দেয়।

১টি উদাহরণঃ

চলুন বিষয়টাকে আরো ভাল ভাবে বাস্তব উদাহরণের মাধ্যমে জানার চেস্টা করি।

কোন একটি বিষয়ে আপনি বললেন আপনার ২ বছরের অবিজ্ঞতা আছে। এই কথাটিকে আরো স্পেসিক করে বলতে পারেন। আমি অমুক কোম্পানিতে অমুক সেকশনে কাজ করার ২ বছরের অবিজ্ঞতা আছে।

এটার সোজাসুজি মানে হচ্ছে আপনি যখন কথা বলবেন তখন সেই কথাটি যতটা সম্ভব পরিমাপযোগ্য করে কথা বলবেন।

 

সঠিক কথা বলাঃ

যখন কারো সাথে কথা বলবেন তখন খেয়াল রাখতে হবে যেন সব কিছু ঠিক ঠিক ডেলিভারী হয়।

কোন কিছু সঠিকভাবে না হওয়ার সাধারণত ৪ টি কারণ রয়েছেঃ

ভুল-উচ্চারণঃ

ইংরেজি ভাষার যখন কোন শব্দ উচ্চারণ করতে চাইলে তখন সেটার একদম সঠিক উচ্চারণ করতে হবে।যেমন “গভর্নমেন্ট” কে “গভরমেন্ট” ইত্যাদি বলা যাবে না।

যদি শব্দের সঠিক উচ্চারণ জানা না থাকে তবে ইংরেজি ভাষা শেখার উপর জোর দেওয়া উচিৎ। কিন্তু খেয়াল রাখতে হবে যেন তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে যেন ভুল শব্দ উচ্চারিত না হয়।

ভুল ব্যাকরণঃ

খুব ভাল ইংরেজিতে দখল না থাকলে ইংরেজি পরিহার করাই সবচেয়ে ভাল।যখন কারো সামনে কথা বলার সময় ইংরেজি বলে ফেলবেন, খেয়াল রাখবেন যেন সেই ইংরেজিটা গ্রামাটিক্যালি যেন ঠিক থাকে। প্রয়োজনে ছোট ছোট শব্দের বাক্য ব্যবহার করতে পারেন।

কথা বলার সময় ভুল ইংরেজি জ্ঞানী শ্রোতাদের বিচলিত করে তোলে। তাঁরা আপনার সম্পর্কে ভিন্ন কিছু ভাবুক, তারচেয়ে অনেক ভাল জেনে ইংরেজি বাক্য ব্যবহার করা।

ভুল কথা বা ভুল তথ্যঃ

কথা বলার সময় লোকে প্রায়ই রেফারেন্স দিয়ে থাকি। অথবা এমন একটি কথা বলে ফেললাম যেটার মূল উৎস আদৌ ঠিক আছে কি’না সেটা যাচাই করা হয় নি। যথেষ্ট পরিমাণ জ্ঞান না থাকলে সে বিষয়ে কথা না বলাই অনেক ভাল। ভুল তথ্য দিয়ে শ্রোতা আপনার যোগ্যতা এবং জ্ঞানের ওপর প্রশ্নচিহ্ন লাগিয়ে দেয়।তাই যখনি কোন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কথা বলার প্রয়োজন হয় তার আগে সেই বিষয়ে কিছু রিসার্চ করুন।

বাচন ভঙ্গিঃ

বাচন ভঙ্গি বা কথা বলার ভঙ্গি অনেক গুরুত্বপূর্ণ। বাচনভঙ্গি বদলে গেলে কথাটার অর্থই বলদে যায়। এই প্রসঙ্গে একটা উদাহরণ দেওয়া যায়। একটা ইন্ডিয়ান প্রেজেন্টেশনে শায়েরী শুনেছিলেন

“না গিলা করতা হু, না শিকবা করতা হু,

তুম সালামত রহো, ইয়ে দুয়া করতা হু”

একজন বাঙালির এই শায়েরীটা অনেক বেশি পছন্দ হয়ে গেছে। সে যখন এই শায়েরীটা একটা বাঙ্গালী বাচনভঙ্গিতে বলতে গেলো তখন সে এইভাবে বললোঃ

“না গিলা করতা হু, না সুখা করতা হু,

তুম শালা মত রহো, ইয়ে দুয়া করতা হু”

 

আপনি যখন মুভি দেখেন সেখানের বিভিন্ন পাঞ্চ লাইন শুনে থাকবেন নিশ্চয়।বিশেষ করে বলিউডের মুভিতে তো প্রচুর। এই সকল পাঞ্চলাইন যদি বাংলা করে বলতে যান তবে দেখবেন ভাষার অর্থটা বদলে গেছে।

একান্তই যদি আপনি এই ধরণের শায়েরী ব্যবহার করতে চান তবে শ্রোতা বুঝে যেই ভাষায় ওইটা রচনা করা হয়েছে সেই ভাষাতেই বলার চেস্টা করুন। এর ফলে শিক্ষিত সমাজে একজন গুণী বক্তা হিসেবে কদর পাবেন।

 

সংক্ষিপ্ত কথাঃ

কিছু মানুষ আছেন যারা কথা বলা শুরু করলে আর থামতেই চান না। বিশেষ করে আমাদের দেশের নেতা শ্রেণীর মানুষরা। তাদের এই কথা বলার বিশেষ গুন “সংক্ষিপ্ততা” সম্পর্কে শেখা বিশেষ প্রয়োজন।

একটা বিষয় মনে রাখতে হবে পূর্ব পরিকল্পিত অনুষ্ঠান গুলিতে প্রতিটি বক্তার জন্য আগে থেকেই সময় নির্ধারণ করা থাকে। তাই যদি কেউ তার সময় থেকে বেশি নিয়ে নেয় তাহলে তার পরবর্তি বক্তার সময় কম পড়ে যায়। এতে করে অনুষ্ঠান উপস্থাপনে একটা বিশৃঙ্খলা দেখা দিতে পারে।

তাই নিজ নির্দিষ্ট সময়ে বক্তব্য যথাযথ এবং সম্পূর্ণ বক্তব্য রাখাটা বক্তার দায়িত্ব।

বক্তব্য প্রদানের সময় জোরালো লাইনগুলো অনেক বেশি মানুষের মনে থাকে আর এতে মানুষ অনেক বেশি প্রেরণা পায়।

যেমন বাংলাদেশের বিখ্যাত সেই লাইনটা “আর যদি একটা গুলি চলে……”

এই রকম আরো অনেক উদাহরণ দেওয়া যায়

যেমন মার্থিন লুথারকিং এর

“আই হ্যাভ এ ড্রিম ( আমার একটা স্বপ্ন আছে)

এই সকল জোরালো বাক্যগুলো আজও মানুষের মনে অনুপ্রেরণার জায়গা করে নিয়েছে।

কম শব্দে সারগর্ভিত বক্তব্য রাখতে পারলে বক্তা শ্রোতাদের ওপরে বেশি প্রভাব বিস্তার করতে পারে আর এই ধরণের জোরালো শব্দ শ্রোতাদের দীর্ঘদিন মনে থাকে।

 

কথার মশলাঃ

কথা বলার এই বিশেষ কৌশলটি যদি আপনি রপ্ত করতে পারেন তাহলে আপনি যেকোন কথাপকথন, অফিসের মিটিং, যেকোন প্রতিযোগীতামুলক পরীক্ষা আর মঞ্চে উঠেও একজন বক্তা হিসেবে সব রকম পরিস্থিতিতেও বিশেষ প্রভাব বিস্তার করতে পারবেন।

রঙিন কথা বলার মানে হচ্ছে একই অর্থের বিভিন্ন বাক্যকে বিভিন্ন ভাবে বলা এবং এর মূল উদ্দেশ্যে হচ্ছে শ্রোতার উপর বক্তার বিশেষ প্রভাব বিস্তার করা।

এই কথা বলার কৌশল এর মাধ্যমে শ্রোতাদের দিয়ে চোখের সামনে সিনামার মত বাস্তব প্রতিচ্ছবি চিত্রায়িত করা যায়।

কয়েকটি উদাহরণঃ

প্রাথমিক চিকিৎসার উপর পিতা মাতার সচেতনতা শীর্ষক আলোচনায় এক বক্তার উদাহরণ সরাসরি এখানে বলা যেতে পারে।

“একবার আমি নিজের গাড়ীতে চেপে যাচ্ছিলাম। হঠাত আমার গাড়ির থেকে কিছুটা দূরে একটা গাড়ি উল্টে গেল। সেই গাড়ীতে এক দম্পতি আর দুট বাচ্চা ছি। সেই ভদ্রলোক প্রচন্ড সাহসী ছিলেন। আহত হওয়া স্বত্বেও উনি নিজের পত্নী আর বাচ্চাকে গাড়ি থেকে বের করে আনলেন। অন্য বাচ্চাটা অজ্ঞান হয়ে পড়েছিল। ও ড্যাশবোর্ড আর সীটের মাঝে ফেসে ছিল। বাচ্চাটার শ্বাস বন্ধ হয়ে আসলছি। সেই ভদ্রলোক বাচ্চাটাকে তৎক্ষণাৎ কৃত্রম শ্বাস দিলেন আর বিভিন্ন জরুরী চিকিৎসার প্রয়োগ করলেন। কয়েক মূহুর্তের ভেতরে সেই বাচ্চাটা চোখ মেলে তাকাল আর ধীরে বলল “ বাবা” বাচ্চাটির পিতা ওকে নতুন জীবন দান করেছিলেন”।

এই বার উনি উপস্থিত দর্শকের উদ্দেশ্যে প্রশ্ন করতে শুরু করলেন।

আমি আপনি কি এই ধরণের পরিস্থিতিতে নিজেদের বাচ্চাদের রক্ষা করতে পারবো?

যদি আপনার উত্তর নেতিবাচক হয়, তাহলে আপনি জানেন যে , আজ আপনার কি করা উচিৎ। আসুন, জরুরী চিকিৎসা শিখি।

সমস্থ শ্রোতারা ভেতর থেকে বিচলিত আর চিন্তিত হয়ে উঠেছিলেন আর মনোযোগ সহকারে শিখতে শুরু করেছিলেন।

আরেকটা উদাহরণ দেওয়া যাতে পারে;

রাস্তায় ট্যাফিক আইন মেনে চলার জন্য বলা যেতে পারে,

“আপনি চাইলে রাস্তায় সমস্থ নিয়ম ভেঙ্গে আপনার নিজের গাড়ী জোরে চালাতে পারেন। কিন্তু একবার ভেবে দেখুন, আপনার যদি একটা একসিডেন্ড হয়ে যায় তাহলে বাড়িতে আপনার জন্য বসে থাকা আপনার “মা” কে আপনি কি জবাব দিবেন?

আপনি আসবেন বলে অপেক্ষারত আপনার মেয়েটীকে কি জবার দিবেন? এটাই কি বলবেন যে, তোমাদের এই ভালোবাসা উপেক্ষা করে রাস্তায় জোরে গাড়ি চালানোতে আমার অনেক বেশি মজা লাগে?”

যদি আপনার উত্তর না হয় তাহলে আজকে থেকে রাস্তায় যখন গাড়ি নিয়ে বের হবেন তখন আপনার কিভাবে গাড়ী চালানো উচিৎ আশা করি আপনি জানেন।

কাগজে একটা গল্প পড়েছিলাম, আমিরকায় রাস্তার ট্র্যাফিক আইন মানার জন্য লোক জনকে সতর্ক করে একটা নতুন বার্তা লিখেছিল “আপনি যদি আপনার দোষে একসিডেন্ট করে মারা যান, তাহলে আপনার স্ত্রী আপনাকে ক্ষমা করবে না”

বিষয়টা অনেক ফানি না?

এবার আসল কথায় আশা যাক, মূল বিষয়টা হচ্ছে আপনি যখন কোন ব্যক্তির সামনে কথা বলবেন কিংবা কোথাও কোন ভাষণ দিতে চাইবেন, স্টোরি টেলিং এর মাধ্যমে এমনভাবে ঘটনার চিত্রায়ণ করবেন যাতে দর্শকের মনে গেথে যায়।

অনেক সাধারণ ঘটনাও কিছু কিছু লেখকের লেখায় সেটা অনেক অসাধারণ হয়ে উঠে।

একবার ট্রাই করে দেখতে পারেন। বাড়ীতে কেউ থাকলে তাকে একটা গল্প বলে দেখতে পারেন, গল্পটা আপনি কতটা বাস্তবতার মত করে উপস্থাপন করতে পারেন। যদি আপনি সফল হোন তাহলে তো আলহামদুলিল্লাহ্‌ , আর যদি না হয় তাহলে এইটা আপনার চর্চা করা উচিৎ।

কমন্সেন্স বা সাধারণ জ্ঞানঃ

প্রায়ই আমরা শুনে থাকি ওমুকের কমন সেন্স নেই, তুমুকের কমনসেন্স নেই। এখন প্রশ্ন হছে এই কমনসেন্স জিনিসটা আসলে কি?

কমন সেন্স কি?

চলুন একটা উদাহরণের মাধ্যমে কিছুটা ধারণা দেওয়ার চেস্টা করি। একজন শিক্ষক পড়ানোর সময় যেসব প্রশ্ন বেশি গুরুত্ব দিয়ে পড়তে বলেছেন সেই সব প্রশ্নের মধ্যে যদি পরীক্ষায় প্রশ্ন আসে তাহলে আমরা বলি প্রশ্ন কমন পড়েছে; কি তাই তো?

তাহলে বিষয়টা কি দাঁড়াচ্ছে?

প্রশ্ন যেহেতু দু’টি ক্ষেত্রেই আছে তাই সেটা কমন বা কমন পড়েছে।

সুতারাং কমন বৈশিষ্ট্য উপলব্ধি করার ক্ষমতাই হলো কমন সেন্স।

কমন সেন্স মানে সাধারণ জ্ঞান হলেও এটির প্রকৃত অর্থ হচ্ছে সাধারণ বোধ ক্ষমতার উপলব্ধি।

কমনসেন্সের বিস্তারিত তথ্যঃ

ধরুন আমাদের চারিদিকে যদি তাকাই সেখানে যা কিছু ঘটছে তার সবটাই কমন বিষয়। প্রতিনিয়ত এই সমস্থ বিষয় ঘটেই চলেছে। সেটা আমরা বুঝতে পারি বা না পারি।

এই প্রতিনিয়ত ঘটে চলা ঘটনা গুলো বুঝতে পারাটা হচ্ছে কমন সেন্স।

একটা গরুর ৪ টি পা বা পাখির ২ টি ডানা আছে সে উড়তে পারে ইত্যাদি কমন সেন্স।

সেন্স মানে হচ্ছে বোঝার ক্ষমতা।

চারপাশের উপকরণের তথ্য উপাত্ত বা বৈশিষ্ট্য গুলি পর্যবেক্ষণ, বিশ্লেষণ করে এইটা পূর্ণ ধারণা দাড় কারানোও একটা কমন সেন্স।

ধরুন আকাশে মেঘ করছে আপনি ছাতা নিয়ে বের হলেন এটা বৃষ্টি হওয়ার পূর্ববর্তি ঘটনা বোঝার কমনসেন্স।

কমন সেন্সের আরেকটা মানে হচ্ছে হচ্ছে কাণ্ডজ্ঞান।

কান্ড বা ঘটনা সম্পর্কে বিশেষ জ্ঞান।যা কিছু ঘটছে সেগুলো সম্পর্কে যতটুকু ধারণা না থাকলে নয় সেটা হচ্ছে কমন সেন্স।

কোন একটি বিষয়ে কারো কমন সেন্স আছে কি’না সেটা কিভাবে বোঝা যাবে?

কমন সেন্স সবারি আছে। কিছু মানুষ আছে যারা এই সমস্থ সাধারণ ঘটনা বা ঘটনার বিশ্লেষণ করে খুব দ্রুত একটা সমাধানে পৌঁছাতে পারে; আমরা বলি তাদের কমন সেন্স প্রচুর।

কমনসেন্সের কয়েকটি উদাহরণঃ

অফিসের মিটিং এ একটা বিষয়ে হঠাত কেউ আপনাকে জিজ্ঞাসা করলেন যার উত্তর আপনার জানা নেই। আপনি তখন না ঘাবড়ে গিয়ে বললেন; “ওকে দারুন প্রশ্ন আমরা একটা পেয়েছি। আসুন আমরা সবাই মিলে এই জিনিসটা বোঝার চেস্টা করি। এই বিষয়ে কে কে জানেন একটু হাত তুলুন”। এটা একটা কমন সেন্সের উদাহরণ। কারণ আপনি জানেন সেই প্রশ্নের উত্তর আপনি না জানলেও ঐখানে উপস্থিত ব্যক্তিবর্গের মধ্যে কেউ তো নিশ্চয় জানবে। আপনি যে জানেন না সেটা না বলে আপনি সবাইকে এই প্রশ্নের উত্তর দিবার সুযোগ করে দিয়ে নিজেও কৌশলে জেনে নিলেন। এটা আপনার কমন সেন্স।

একজন ভাল শিক্ষক প্রতি বছরের বোর্ড পরীক্ষার প্রশ্ন এনালাইসিস করে পরের বছরের বোর্ড পরীক্ষার জন্য সম্ভব্য প্রশ্ন প্রণয়ণ করে এটা কমন সেন্স তেমনি একজন বিশেষজ্ঞ ডাক্তার তার কমন সেন্স দিয়েই অনেক জটিল রোগের সহজ চিকিৎসা করতে পারেন।

কোন একটি বিষয়ের অবিজ্ঞতা আপনাকে সেই বিষয়টির ব্যাপারে কমন সেন্স অনেক বাড়িয়ে তোলে।

উপস্থাপনার ক্ষেত্রে কোন একটি বিশেষ বিষয়ের আলোচনা সভায় সেই বিষয়ের বিরুদ্ধে কথা বলা উচিৎ নয়। যেমন আপনাকে একটি চিকিৎসকদের সভায় যথযথ প্রসঙ ছাড়া চিকিৎসা জগতের ওপর আঘাত হানা উচিৎ নয়। চিকিৎসার নামে ব্যবসা ইত্যাদি প্রসঙ্গ টেনে না নিয়ে বরং আপনি চিকিৎসা সেবা মানব কল্যাণে কতটা ভুমিকা পালন করছে সেই বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলতে পারেন।

কমনসেন্স কি করে?

একটা কমনসেন্স হচ্ছে এমন একটি সাধারণ জ্ঞান যে একজন মানুষকে ঠিক করে দেয়;

কেন বলতে অহবে?

কি বলতে হবে?

কোথায় বলতে হবে?

কাকে বলতে হবে?

কখন বলতে হবে?

পৃথিবীর সব জ্ঞানের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ জ্ঞান হচ্ছে সাধারণ জ্ঞান বা কমন সেন্স বা সাধারণ বোধ ক্ষমতা। এটি হচ্ছে লোকেদের সঙ্গে ব্যবহারের চাবিকাঠি।

কমনসেন্স বাড়ানোর উপায়ঃ

  • প্রচুর পড়াশুনা করতে হবে। বিখ্যাত মানুষের জীবনীগুলি পড়ুন। তাদের আচরণ গুলি অনুসরণ পর্যবেক্ষণ করুন।
  • অনর্থক বা বেহুদা কথাবার্তা থেকে দূরে থাকুন।
  • আপনার আশে পাশের দিকে সতর্কভাবে চোখ রাখুন। বেশি বেশি করে দেখুন, চোখ রাখুন।
  • কথা কম বলুন।
  • অযৌক্তিক বিষয়গুলি এড়িয়ে চলুন।

ক্রিয়েটিভিটি – রচনাত্নক

ক্রিয়েটিভিটি কি?

ক্রিয়েটিভিটি মানে হচ্ছে সৃজনশীলতা বা সৃষ্টিশীলতা বা রচনাত্নক।

একজন উপস্থাপক বা বক্তা যত বেশি ক্রিটিয়েটিভিটির অধিকারী হবেন তত বেশি শ্রোতারা আপনার দ্বারা প্রভাবিত হতে হয়ে উঠবেন।

আপনি যখন কথা বলা শুরু করবেন তখন সৃষ্টিশীলতা দিয়ে আপনি উপস্থিত দর্শককে তাক লাগিয়ে দিতে পারেন।

বিস্তারিত ব্যাখ্যাঃ

সাধারণ কথা বার্তাতেও কেউ কোন বোরিং ব্যক্তিদের সঙ্গ পছন্দ করে না। সবাই প্রাণচাঞ্ছলে ভরপুর হাসিখুশি বন্ধু পেতে চায়। দৈনন্দিন জীবনে আমরা এমন অনেক মানুষের সাথে মিশি আর কিছুদিন পরে ভুলেও যাই। তবে এরি মধ্যে কিছু লোক আছে যারা অন্তরে ছাপ ফেলে যান। অনেকদিন তাদের কথা মনে থাকে। বা বিশেষ কোন ঘটনার জন্য তার কথা সারাজীবন মনে রাখা যায়।

একজন নামকরা উপস্থাপকের ভাষণ শোনার জন্য দূর দুরান্ত থেকে মানুষ টাকা দিয়ে টিকেট কেটে তার কথা শুনতে আসে। তার কথায় নতুনত্ব খুজে পাওয়া যায়। জীবনের নানা গুরুত্বপূর্ণ দিক তার কথায় উঠে আসে। উঠে আসে দৃষ্টিভঙ্গি বদলনোর মত নতুন নতুন চিন্তাভাবনা। সব কিছুর সমন্বয়ে যখন সে একটি চমৎকার উপস্থাপনা উপহার দেয় সেটা শুনে উপস্থিত দর্শক বিস্মিত হয়ে যান।

ছোট বেলায় আমরা ক্রিটিয়েটিভিটি বলতে বুঝতাম ডানপিটে, দৌড়াদৌডড়ি, কথা না শুনা, ইচ্ছামত ছবি আর্ট করা, কিংবা বড় বড় বিশেষজ্ঞের মত কথা বলা।

ক্রিয়েটিভিটির কয়েকটি উদাহরণঃ

যে পেশাতেই থাকি দুর্দান্ত কোন ক্রিয়েটিভ বলে থাকি। ২২ বছরের ক্যারিয়ারে শচীন টেন্ডূল্কারের সৃজনশীলতা প্রকাশ করে। তেমনি দুর্দান্ত মারকুটে আকাশ ছোয়া ছক্কা হাঁকানো দ্য মাইটি গেইলকে বক্সিং ক্রিকেটার হিসেবে সৃজনশীল বলা যায়।

একজন মানুষ তার পেশায় সৃজনশীল কি’না সেটা নির্ভর করছে আপনি সৃজনশীলতা বলতে কি বুঝেন সেটার উপর।

এই সৃজনশীলতা বা ক্রিয়েটিভিটি কে নানা ভাবেই ভাবা যায়। একজন পরিচালকের কোন একটি বিষয়ে খুব চমৎকার করে তুলে ধরাটাকে তার সৃজনশীলতা তেমনি টিভিটে বিজ্ঞাপনের কয়েক মূহুর্তওকেও সৃজনশীলতা বলা যায়। টিভি বিজ্ঞাপনের কয়েকটি মিনিটেই আপনার কাছে যথাযথ কোয়ালিটি সহ পণ্যটি বিক্রয়ের আহবান চমৎকার ভাবে তুলে ধরা হয়। সাড়ে পাঁচশ বছর আগে ইতালির ফ্লোরেন্স শহরে বসে এক পাগলাটে ভাবুক আকাশে উড়ার মন্ত্র দিয়ে খ্রিষ্টান গীর্জাকে কাপিয়ে দিয়েছিল। সেই লিওনার্দো ভিঞ্চির কল্পনার সৃজনশীলতাই এখনকার হেলিকাপ্টার।

সৃজনশীলতার নেই কোন প্রচলিত ফর্মুলা, নেই কোন ল্যাবরেটরির পরিবেশ। শহরের ভিড়ের ভিতরেও তৈরি হতে পারে সৃজনশীলতা। প্রচন্ড ভিড়ের বাসের মধ্যে পেয়ে যেতে পারেন একটা চমৎকার আইডিয়া। এই আইডিয়ার ভাবনার শেষ ফলাফলই কিন্তু সৃজনশীলতার মাপকাটি।

যা সবাই ভাবছে তা একটু অন্যভাবে ভাবাই হচ্ছে সৃজনশীলতা, উদ্ভাবনী আইডিয়া। উপস্থাপক হিসেবে আপনাকে এই দক্ষতা অর্জন করতে হবে।

কথায় কথার মাঝে কথা সাজিয়ে একটা চমৎকার বক্তব্য দিতে পারেন। একটা সাধারণ জিনিস যেটা দর্শকের হাতের কাছেই হয়তো আছে, সেই জিনিসটার ব্যবহার অন্যভাবে দেখিয়ে দিয়েও আপনি সৃজনশীলতার পরিচয় দিতে পারেন।

একজন উপস্থাপকের শব্দের মধ্যে, ভাব ভঙ্গির মধ্যে এবং প্রস্তুতির সমস্থ ক্ষেত্রে নিজের কল্পনাশক্তি আর রচনাত্নক নিয়ে আপনি সৃজনশীল বক্তব্য পেশ করতে পারেন।

আসুন আমরা প্রতিদিন প্রাকটিস করি দিনে অন্তত একবার একজন মানুষের সাথে এমনভাবে মিট করবো যাতে সেই মানুষটা অন্তত বহুদিন আমাদের কথা মনে রাখে। একজন উপস্থাকের এই গুনটি যত বেশি অর্জন করতে পারবে তত বেশি সফল বক্তা হিসেবে পরিচিতি লাভ করতে পারবে।

শিষ্টাচারী কথাঃ

একজন বক্তার জন্য এই গুনটি অর্জন করা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। জ্ঞানী বক্তার চরিত্রের অলংকার হচ্ছে শিষ্টারচারবোধ।

একে বিনম্রতা বা সৌজন্যতা বা শিষ্টাচার ইত্যাদি নানান শব্দে সম্বোধন করে থাকি।এটি শুধু ভাষারই নয়…বরং ব্যক্তির চরিত্রের অলংকার হওয়া উচিৎ।

নিজের উপলব্ধির ওপরে খুশী হয়ে ওঠা, কিন্তু অহংকার থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখা হচ্ছে বিনম্রতারই এক রুপ।

কাউকে আন্তরিকভাবে ধন্যবাদ জানানো, নিজের ভুলের জন্য বিনম্রতার সঙ্গে ক্ষমা প্রার্থনার করা আর অন্যদের প্রতি সম্মান জানানো হচ্ছে ব্যক্তিত্বের অমূল্য গুণ।

যেসব ব্যক্তি নিজেদের জীবনে কিছু মাত্রায় সাফল্য অর্জন করেই অহংকারে ভরে উঠেন, অন্যদের সাথে দুর্ব্যবহারের মেতে উঠেন তাঁরা কখনো ভাল বক্তার সুনাম পেতে পারে না।

শিষ্টাচার কিভাবে শিখবেন?

ভাল বইও একজন সৎ অবিভাবকের মত শিষ্টাচার শেখাতে পারে। ইউটিউব থেকে প্রচুর মটিভেশনাল ভিডিও দেখতে পারেন। সম্ভব হলে আপনার এলাকার ট্রেনিং সেন্টার গুলিতে ট্রেনিং নিতে পারেন।

ব্যক্তি, সমাজ ও জাতীয় জীবনে সুস্থতা ও সমৃদ্ধি অর্জনে শিষ্টাচার শেখার কোন বিকল্প নেই।

 

মুখ্য পয়েন্টঃ

  • নিজের কথা ধীরে সুস্থে স্পষ্ট করে বলুন।
  • অস্পষ্ট কথা না বলে পয়েন্ট অনুযায়ী কথা বলুন।
  • যা বলবেন সঠিকভাবে বলুন- উচ্চারণ, ব্যাকরণ এবং বিশ্বাসযোগ্যতার প্রতি বিশেষ দৃষ্টি দিন।
  • সংক্ষিপ্ত কথা বলুন, কম শব্দে বেশি কথা বলার চেস্টা করুন।
  • সাধারণ জ্ঞানকে অন্য আর সব জ্ঞানের ওপরে স্থান করে দিয়ে কথা বলুন।
  • নিজের কথায় রচনাত্নকতা এবং মৌলিকতা সৃষ্টি করুন।
  • বিনম্রতা আর শিষ্টাচারের নিয়মগুলো মেনে চলুন।

এবার আপনার পালা।

৮ টি পয়েন্ট আমি আবারো উল্লেখ করছি।

আপনি আমায় বলুন কোন পয়েন্টে আপনি কি শিখেছেন?

CLARITY                     – স্পষ্টতা

CONCRETENESS    – নিরেট / মূর্ত্য

CORRECTNESS       – সঠিক

CONCISENESS        – সংক্ষিপ্ত

COLORFUL               – চিত্রিত / রঙিন

COMMONSENSE    – সাধারণ জ্ঞান

CREATIVITY            – রচনাত্নক

COURTESY               – বিনম্রতা, শিষ্টাচার

 

আজকে এই পর্যন্তই। পরের পর্বে কথা বলার টেকনিক বাকী ৩টি “C” নিয়ে কথা বলবো ইনশাল্লাহ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *